দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কোনো দেশে উৎসব মানেই কয়েক দিনের আনন্দ, কোথাও আবার উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে থাকে বছরের প্রায় প্রতিটি মাসে। ধর্মীয় আচার, জাতীয় দিবস, ঐতিহ্যবাহী আয়োজন কিংবা ঋতুভিত্তিক উৎসব, সব মিলিয়ে কিছু দেশের ছুটির ক্যালেন্ডার বেশ দীর্ঘ। এমনকি সরকারি ছুটির সংখ্যায় বিশ্বের অনেক পরিচিত দেশকেও পেছনে ফেলেছে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ। সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে নেপাল। আর বাংলাদেশও আছে প্রথম পাঁচের মধ্যে।
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, বছরে সবচেয়ে বেশি সরকারি ছুটির দেশ নেপাল। দেশটিতে সরকারি ছুটি ৩৫ দিন। এরপরই রয়েছে ইরান, যেখানে ছুটির সংখ্যা ২৬ দিন। মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় রয়েছে ২৫ দিন করে সরকারি ছুটি। ২২ দিনের ছুটি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।
উৎসবের ছুটিতে শীর্ষে নেপাল
নেপালে উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির প্রধান উৎসব দশাইন ও তিহার ঘিরে পরিবার, সমাজ ও জনজীবনে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। হিন্দু ঐতিহ্যের পাশাপাশি বৌদ্ধ, ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের বিভিন্ন উৎসবও দেশটির ছুটির তালিকায় স্থান পেয়েছে। সব মিলিয়ে বছরে ৩৫ দিন সরকারি ছুটি নিয়ে তালিকার শীর্ষে নেপাল।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইরানে সরকারি ছুটি ২৬ দিন। দেশটির ছুটির ক্যালেন্ডারে রয়েছে ইসলামি ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও প্রাচীন পারস্য সংস্কৃতির মেলবন্ধন।

পারস্যের নববর্ষ নওরোজ বসন্তের আগমনকে স্বাগত জানানোর উৎসব। এ সময় পরিবারগুলো একত্র হয়, চলে ভোজ ও প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর আয়োজন। আশুরা ও ঈদসহ ধর্মীয় উপলক্ষগুলোও ইরানের ছুটির তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
পূর্ণিমা থেকে নববর্ষ, উৎসবের ছন্দে মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কা
তালিকার তৃতীয় স্থানে মিয়ানমার। দেশটিতে বছরে সরকারি ছুটি ২৫ দিন। বৌদ্ধ ঐতিহ্য দেশটির উৎসবের বড় অংশজুড়ে রয়েছে। মিয়ানমারের নববর্ষ থিংইয়ান উদ্যাপনে দেশজুড়ে চলে পানি ছোড়াছুড়ি। চান্দ্রপঞ্জিকা অনুসারে পূর্ণিমার দিনগুলোতেও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন হয়। মানুষ মন্দিরে যায়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়।
একই সংখ্যক সরকারি ছুটি রয়েছে শ্রীলঙ্কায়ও। দেশটিতে প্রতি মাসের পূর্ণিমা তিথি পোয়া দিবস হিসেবে পালিত হয়। এর পাশাপাশি সিংহলি ও তামিল নববর্ষ, বুদ্ধের জন্মদিন হিসেবে পরিচিত ভেসাক এবং খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মীয় উৎসবও ছুটির ক্যালেন্ডারে রয়েছে। ফলে দ্বীপরাষ্ট্রটির বছরজুড়েই উৎসবের নানা উপলক্ষ থাকে।
২২ দিনের ছুটি বাংলাদেশে
তালিকার পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। বছরে সরকারি ছুটি ২২ দিন। ঈদ, দুর্গাপূজা ও বাংলা নববর্ষের মতো উৎসব দেশের মানুষের জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইসলামি ও হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের মতো জাতীয় দিবসও ছুটির তালিকায় রয়েছে। ধর্মীয় বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জাতীয় ইতিহাস মিলিয়ে বাংলাদেশের ছুটির ক্যালেন্ডারে প্রায় সারা বছরই কোনো না কোনো উৎসবের উপলক্ষ থাকে।
বাংলাদেশের পরের অবস্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া ও ভারত। দুই দেশেই সরকারি ছুটি ২১ দিন। কম্বোডিয়ার প্রধান উৎসব খেমার নববর্ষ তিন দিন ধরে পালিত হয়। এ সময় পানি ছোড়াছুড়িসহ নানা আয়োজন থাকে। পূর্বপুরুষদের স্মরণে পচুম বেন এবং জল উৎসব বন ওম তুকও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।
ভারতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে উৎসবের ধরন অঞ্চলভেদে বদলে যায়। দীপাবলি, হোলি, ঈদ, বড়দিন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের নববর্ষ উদ্যাপন দেশটির ছুটির ক্যালেন্ডারে জায়গা করে নিয়েছে। রাজ্যভেদে ছুটির তারতম্য থাকায় ভারতের সব অঞ্চলে একই দিনে ছুটি থাকে না।
ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোও তালিকায়
ইউরোপের ছোট্ট দেশ লিশটেনস্টাইনে বছরে সরকারি ছুটি ২০ দিন। দেশটির জাতীয় দিবস ১৫ আগস্ট উদ্যাপন করা হয় আতশবাজিসহ নানা আয়োজনে। ক্যাথলিক ঐতিহ্যের প্রভাবে মেরির স্বর্গারোহণ দিবস ও সর্বসাধু দিবসের মতো ধর্মীয় দিনও ছুটির তালিকায় রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতেও সরকারি ছুটি ২০ দিন। সেপ্টেম্বরে দেশটির স্বাধীনতা উদ্যাপন উপলক্ষে চলে নানা আয়োজন, যার মধ্যে রয়েছে ঘোড়ায় চড়া প্রদর্শনী ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। ক্যাথলিক ধর্মীয় দিবস, শ্রমিক দিবস ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী দিবসও দেশটির ছুটির তালিকায় রয়েছে।
চীনা ও পর্তুগিজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা ম্যাকাওয়েও বছরে সরকারি ছুটি ২০ দিন। চন্দ্র নববর্ষ, নিষ্কলঙ্ক গর্ভধারণের উৎসব এবং বুদ্ধের জন্মদিন দেশটির উল্লেখযোগ্য ছুটির মধ্যে রয়েছে।
এরপর ১৯ দিনের সরকারি ছুটি নিয়ে রয়েছে লেবানন। দেশটির মুসলিম, খ্রিষ্টান ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন উৎসব ছুটির তালিকায় স্থান পেয়েছে। ঈদ থেকে শুরু করে ইস্টার, নানা ধর্মীয় আয়োজন দেশটির বহুধর্মীয় সমাজের প্রতিফলন।
১৮ দিনের ছুটিতে এশিয়া, ইউরোপ ও ক্যারিবীয় অঞ্চল
মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ফিলিপাইন, পূর্ব তিমুর ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে বছরে সরকারি ছুটি ১৮ দিন করে। মালয়েশিয়ায় ঈদ, চীনা নববর্ষ, দীপাবলি ও বড়দিনের পাশাপাশি আঞ্চলিক ছুটি এবং রাজার জন্মদিন পালিত হয়।
কলম্বিয়ায় ক্যাথলিক ঐতিহ্যের প্রভাব স্পষ্ট। পবিত্র সপ্তাহের ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি বারানকিয়ায় কার্নিভাল দেশটির উল্লেখযোগ্য উৎসব। শ্রমিক দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও জাতিগত সমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দিবসও পালিত হয়।
ফিলিপাইনে বড়দিন, পবিত্র সপ্তাহ ও বিভিন্ন সাধুর স্মরণে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছুটির ক্যালেন্ডারে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা দিবস, নিনয় আকিনো দিবস এবং ঈদুল ফিতরও দেশটির সরকারি ছুটির অন্তর্ভুক্ত।
পূর্ব তিমুরে বড়দিন, ইস্টার ও পবিত্র সপ্তাহের পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদুল ফিতরও স্বীকৃত ছুটির মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে উপবাসের সময় শুরুর আগে কার্নিভাল ঘিরে বড় আয়োজন হয়। হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় উৎসবও দেশটির ছুটির তালিকায় রয়েছে।
চীনা ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মিশেলে হংকংয়ে সরকারি ছুটি ১৭ দিন। চন্দ্র নববর্ষ, ছিং মিং, বুদ্ধের জন্মদিন, বড়দিন ও ইস্টার সেখানকার উল্লেখযোগ্য ছুটি।
১৬ দিনের ছুটিতে ১০ দেশ
আর্জেন্টিনা, আইসল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও তানজানিয়ায় বছরে সরকারি ছুটি ১৬ দিন করে।
আর্জেন্টিনার ছুটির তালিকায় রয়েছে স্বাধীনতা দিবস, মালভিনাস দিবস ও ক্যাথলিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান। আইসল্যান্ডে জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় ও ধর্মীয় উপলক্ষ পালিত হয়। দীর্ঘ ছুটির সময়ে দেশটির মানুষ প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটাতে পছন্দ করে।
ইন্দোনেশিয়ায় ছয়টি সরকারি স্বীকৃত ধর্মের উৎসব ছুটির ক্যালেন্ডারে জায়গা পেয়েছে। ঈদ, নেপি বা নীরবতার দিন, বড়দিন এবং বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে ছুটি থাকে। জাপানে মে মাসের গোল্ডেন উইক একাধিক জাতীয় ছুটিকে একসঙ্গে নিয়ে আসে। নববর্ষ, সাবালকত্ব দিবস এবং পূর্বপুরুষদের স্মরণে ওবোনও দেশটির উল্লেখযোগ্য আয়োজন।
কাজাখস্তানে নওরোজ, সংবিধান দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি ঈদ ও বিজয় দিবস পালিত হয়। মঙ্গোলিয়ায় নাদাম উৎসবে কুস্তি, তীরন্দাজি ও ঘোড়দৌড়ের আয়োজন থাকে। চন্দ্র নববর্ষ সাগান সারও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।
মরক্কোর ছুটির বড় অংশজুড়ে রয়েছে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও মহানবীর জন্মদিন। সিংহাসন দিবস ও গ্রিন মার্চ দিবসের মতো জাতীয় দিবসও পালিত হয়। তাইওয়ানে চন্দ্র নববর্ষ, ড্রাগন নৌকা উৎসব, মধ্য শরৎ উৎসব এবং অক্টোবরে জাতীয় দিবসের আয়োজন রয়েছে।
থাইল্যান্ডে নববর্ষের উৎসব সংক্রানে দেশজুড়ে পানি ছোড়াছুড়ি হয়। রাজপরিবারের সদস্যদের জন্মদিন, বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসব ও ভাসমান প্রদীপের উৎসব লয় ক্রাথংও ছুটির ক্যালেন্ডারের অংশ। তানজানিয়ায় খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবস, ইউনিয়ন দিবস এবং কৃষকদের সম্মানে নানে নানে দিবস পালিত হয়।
১৫ দিনের ছুটিতে পাকিস্তানসহ তিন দেশ
পাকিস্তান, লিথুয়ানিয়া ও রোমানিয়ায় বছরে সরকারি ছুটি ১৫ দিন করে। পাকিস্তানে ঈদ, পাকিস্তান দিবস ও কায়েদে আজম দিবসের মতো উপলক্ষ ধর্মীয় বিশ্বাস ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
লিথুয়ানিয়ায় সর্বসাধু দিবস ও মেরির স্বর্গারোহণ দিবসের মতো ক্যাথলিক ধর্মীয় ছুটি রয়েছে। দেশটির দুটি স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে পালিত ঐতিহ্যবাহী জনিনেস উৎসবও উল্লেখযোগ্য।
রোমানিয়ায় অর্থোডক্স খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী ইস্টার ও বড়দিন উদ্যাপন করা হয়। ১ ডিসেম্বর জাতীয় দিবসে কুচকাওয়াজ ও আতশবাজির আয়োজন থাকে। মার্চের ১ তারিখে মার্তিসর উৎসবের মাধ্যমে বসন্তকে স্বাগত জানানোর ঐতিহ্যও রয়েছে।
ছুটির সংখ্যার আড়ালে সংস্কৃতির গল্প
এই তালিকায় দেখা যায়, সরকারি ছুটির সংখ্যা শুধু কাজ থেকে বিরতির হিসাব নয়। কোনো দেশে ধর্মীয় বিশ্বাস ছুটির ক্যালেন্ডারকে প্রভাবিত করেছে, কোথাও জাতীয় ইতিহাস ও স্বাধীনতার স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ, আবার কোথাও ঋতু ও প্রকৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে উৎসবের ঐতিহ্য।
৩৫ দিনের সরকারি ছুটি নিয়ে নেপাল তালিকার শীর্ষে, আর ২২ দিন নিয়ে বাংলাদেশ রয়েছে পঞ্চম স্থানে। তবে তালিকায় দেওয়া সংখ্যাগুলোকে সব দেশ ও সব অঞ্চলে একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে ভারত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে অঞ্চলভেদে ছুটির তারতম্য রয়েছে। ফলে সরকারি ছুটির তুলনার পাশাপাশি প্রতিটি দেশের ছুটির সংজ্ঞা ও গণনার পদ্ধতিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
/অ